মালয়েশিয়া শ্রমবাজারের ‘রক্তচোষা’ সিন্ডিকেট: ১৫ গডফাদারের হাজার কোটি টাকার চাঁদাবাজির রুদ্ধশ্বাস তথ্য ফাঁস
বিশেষ অনুসন্ধানী প্রতিবেদক: বিডিএস বুলবুল আহমেদ (সিনিয়র ডিজিটাল স্ট্র্যাটেজিস্ট ও ক্রাইম এনালিস্ট)
ঢাকা, ৩ এপ্রিল ২০২৬: বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানির ইতিহাসে সবচেয়ে বড় কলঙ্কজনক অধ্যায়ের পর্দা উন্মোচিত হয়েছে। মালয়েশিয়ায় লোক পাঠানোর নামে হাজার হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নেওয়া ১৫ জনের সেই প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের নেপথ্য কারিগরদের নাম এখন আদালতের নথিতে। রিক্রুটিং এজেন্সি মালিক এস এম রফিকের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি এবং বর্তমানে রিমান্ডে থাকা লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর দেওয়া তথ্যে বেরিয়ে এসেছে সাবেক আওয়ামী লীগ সরকারের শীর্ষ পর্যায়ের রাঘববোয়ালদের নাম।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দি এবং ডিবি সূত্রের তথ্য অনুযায়ী, এই সিন্ডিকেটের মূল হোতা ছিলেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপদেষ্টা সালমান এফ রহমান, সাবেক অর্থমন্ত্রী আ ফ ম মোস্তফা কামাল (লোটাস কামাল) এবং সাবেক প্রবাসী কল্যাণ মন্ত্রী ইমরান আহমেদ।
সিন্ডিকেটের সদস্য হওয়ার ‘এন্ট্রি ফি’ ছিল ১০ কোটি টাকা:
তথ্যমতে, বাংলাদেশে প্রায় তিন হাজার রিক্রুটিং এজেন্সি থাকলেও মাত্র ১০৩টি এজেন্সিকে কাজ করার সুযোগ দেওয়া হতো। এই ‘এলিট ক্লাবে’ ঢুকতে হলে শুরুতেই ১০ কোটি টাকা চাঁদা দিতে হতো। এই টাকা সংগ্রহের দায়িত্বে ছিলেন লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী, রুহুল আমিন স্বপন এবং দাতু আমিনের মতো ব্যক্তিরা।
বাংলাদেশের জনশক্তি খাতে সিন্ডিকেটের ইতিহাস নতুন নয়, তবে ২০২৬-এর এই উদ্ঘাটন পূর্বের সব রেকর্ড ভেঙে দিয়েছে।
অতীতের স্মৃতি: ২০০৭-০৮ সালের ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময়ও মালয়েশিয়া শ্রমবাজার নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছিল। মজার ব্যাপার হলো, সেই সময়ের প্রভাবশালী ব্যক্তি লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরী ২০২৪-২৬ পর্বেও একই সিন্ডিকেটের অন্যতম মূল হোতা হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন।
তুলনা: ২০১৮ সালে মালয়েশিয়া সরকার যখন বাংলাদেশের ১০টি এজেন্সির সিন্ডিকেটের কারণে বাজার বন্ধ করে দিয়েছিল, তখন লোটাস কামালের নাম ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। ২০২৪-২৬ পর্বে সেই ১০টি এজেন্সির সিন্ডিকেট বেড়ে ১০৩টিতে রূপ নেয়, যা প্রমাণ করে যে দুর্নীতি আরও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়েছিল।
ডিবি সূত্র জানায়, লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ উদ্দিন চৌধুরীর প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ২০২২ থেকে ২০২৪ সালের মে মাস পর্যন্ত প্রায় ১০ হাজার লোক মালয়েশিয়ায় পাঠানো হয়। প্রত্যেকের কাছ থেকে নির্ধারিত ফি’র চেয়ে কয়েক গুণ বেশি টাকা নেওয়া হয়েছে।
ভুক্তভোগী: সাধারণ শ্রমিকরা জমিজমা বিক্রি করে ৪-৫ লাখ টাকা দিয়ে মালয়েশিয়া গিয়েও কাজ পাননি, যা আন্তর্জাতিক মহলে বাংলাদেশের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করেছে।
অন্যান্য সদস্য: এই সিন্ডিকেটে আরও যুক্ত ছিলেন সাবেক আইজিপি বেনজীর আহমেদ, সাবেক এমপি নিজাম হাজারী, আলাউদ্দিন নাসিম এবং ব্যবসায়ী নূর আলী।
বিডিএস অ্যানালাইসিস: এই সিন্ডিকেট কেবল একটি বাণিজ্যিক অপরাধ নয়, এটি ছিল একটি ‘রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় লুণ্ঠন’। সাবেক প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা থেকে শুরু করে আইজিপি পর্যন্ত যখন এই লুটের ভাগীদার হন, তখন সাধারণ মানুষের বিচার পাওয়ার পথ রুদ্ধ হয়ে যায়। বর্তমানে লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ চৌধুরীর রিমান্ড এবং এস এম রফিকের জবানবন্দি এই খাতের সংস্কারের জন্য একটি টার্নিং পয়েন্ট হতে পারে।
| নাম ও পদবী | সিন্ডিকেটে ভূমিকা | বর্তমান অবস্থা |
| সালমান এফ রহমান | প্রধান পৃষ্ঠপোষক ও গডফাদার | কারাগারে/তদন্তাধীন |
| আ ফ ম মোস্তফা কামাল | নীতিনির্ধারক ও অর্থ সমন্বয়ক | পলাতক/তদন্তাধীন |
| ইমরান আহমেদ | প্রশাসনিক সুবিধা প্রদানকারী | তদন্তাধীন |
| লে. জেনারেল (অব.) মাসুদ চৌধুরী | টাকা সংগ্রহ ও এজেন্সি নিয়ন্ত্রণ | রিমান্ডে |
| বেনজীর আহমেদ | ক্ষমতার প্রভাব ও সুরক্ষা প্রদান | পলাতক |
| দাতু আমিন ও রুহুল আমিন স্বপন | কারিগরি ও মাঠ পর্যায়ের সমন্বয় | তদন্তাধীন |
২০২৪ সালের সেপ্টেম্বর মাসে মামলা হওয়ার পর থেকে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে জনমত গড়ে ওঠে। বর্তমান সরকার এই দুর্নীতিবাজদের আইনের আওতায় আনার যে উদ্যোগ নিয়েছে, তা বাংলাদেশের অভিবাসন খাতের স্বচ্ছতা ফিরিয়ে আনতে সহায়ক হবে। মালয়েশিয়া সরকারও বারবার এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুলেছিল, যা এখন প্রমাণিত।
গরিব মানুষের রক্ত জল করা টাকায় যারা বিদেশের মাটিতে প্রাসাদ গড়েছেন, তাদের বিচার এখন সময়ের দাবি। এস এম রফিকের জবানবন্দি এবং মাসুদ চৌধুরীর রিমান্ডে দেওয়া তথ্যগুলো যদি সঠিকভাবে ব্যবহৃত হয়, তবে ভবিষ্যতে আর কেউ শ্রমবাজার নিয়ে এমন ছিনিমিনি খেলার সাহস পাবে না। ১৯৭১-এর মুক্তির চেতনায় গড়া বাংলাদেশে এমন ‘শোষক’ শ্রেণির কোনো স্থান নেই।
প্রতিবেদক:বিডিএস বুলবুল আহমেদ
আরও খবর জানতে ভিজিট করুন: বাংলাদেশ প্রতিদিন
| ফজর | 3:50 AM ভোর |
|---|---|
| যোহর | 12:04 দুপুর |
| আছর | 4:44 PM বিকাল |
| মাগরিব | 6:50 PM সন্ধ্যা |
| এশা | 8:17 PM রাত |
| জুম্মা | 1.30 pm দুপুর |